হাশরের ময়দানে নবী রাসূলদের জিঙ্গাসা ও ফেরশতাদের জিজ্ঞাসা এবং জিনদের জিঙ্গাসা । হাশরের ময়দানে কি হবে ? Hasorer Moidan

 

হাশরের ময়দানে নবী রাসূলদের জিঙ্গাসা ও ফেরশতাদের জিজ্ঞাসা এবং জিনদের জিঙ্গাসা । হাশরের ময়দানে কি হবে ? Hasorer Moidan

 হাশরের ময়দানে নবী-রাসূল মানুষ ফেরেশতা জিন এর কাছে আল্লাহর জিজ্ঞাসা

কেয়ামতের দিন মানুষদের পিতার নামসহ  মানুষের নাম ধরে ডাকা হবে (অর্থাৎ হে খালেদের পুত্র আবদুল্লাহ বলে ডাকা হবে) । কেয়ামত মানুষকে সম্মানিত ও অপমানিত করবে। হাশরের ময়দানে দুনিয়ার অনেক অবহেলীত লােক হবে সম্মানীত। আর অনেক গর্বিত ও অহংকারী ধনশালী লােক হবে অপমানিত। কেয়ামত হচ্ছে সম্মানিত ও অপমানিত হওয়ার দিন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ 
“ যখন মহা প্রলয় সংঘটিত হবে। সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও মিথ্যার লেশ নেই। সে মহাপ্রলয় (কেয়ামত) কতককে করবে হীন ও
অপমানিত, আর কতককে করবে সম্মানিত ও উন্নত। ” –সূরা ওয়াকিয়া 

 নবীদের কাছে আল্লাহর জিজ্ঞাসা

হযরত নূহ (আ) -এর উম্মত ছাড়া অন্যান্য নবীদের উম্মতগণও স্ব স্ব নবীর তাবলীগ ও হেদায়েতের বাণী প্রচারের কথা অস্বীকার করবে। তারা বলবে, আমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছান হয়নি। তাদের নবীদের কাছে জিজ্ঞেস করা হবে যে, তােমরা কি আল্লাহর বিধান মানুষের কাছে পৌছাওনি? তাঁরা বলবেন, আমরা পৌছিয়েছি। তখন তাদের কাছে সাক্ষী তলব করা হলে তারা হযরত মুহাম্মদ (স) -এর উম্মতগণকে সাক্ষীরূপে পেশ করবেন। তখন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) -কে বলা হবে। এ বিষয়ে আপনি কি বলেন? তিনি বলবেন, হ‍্যা আমি নবীদের দাবীকে সত্যায়িত করছি। উম্মতে মুহাম্মদীর কাছে জিজ্ঞেস করা হবে এ বিষয়ে তােমরা কি জান? জবাবে তারা বলবে, আমাদের কাছে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এসেছেন। তিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, সব নবী-রাসূলগণই নিজ নিজ উম্মতের কাছে আল্লাহ তাআলার বিধান পৌছিয়েছেন (তাফসিরে দুররে মানছুর, ১ ম খণ্ড)  । সততা ও গ্রহণযােগ্যতার দিক দিয়ে নবীগণের মান সর্ব উর্ধ্বে। যেহেতু পরকালের এ মামলায় দু'টি গ্রুপ হবে। এ কারণে সেখানে সুবিচারের জন্য সাক্ষীর প্রয়ােজন। তাই সাক্ষীগণ যদিও নবীদের তুলনায় নিম্নমানের হবে, কিন্তু তাদের সাক্ষ্য ও সততার গ্রহণযােগ্য হওয়ার কথা স্বয়ং মহানবী (সঃ) -ই বলেছেন।


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কাছে জিজ্ঞাসা

যারা নবুয়ত ও বিধান পৌছানাের কথা অস্বীকার করে, তারা তখন একথাও বলতে পারে যে, আমরা যখন নবীগণকে সত্যবাদী স্বীকার করিনি তখন উম্মতে মুহাম্মদীকে কেন সত্যবাদীরূপে সমর্থন করব? এ উত্তর হল, এরূপ কোন কথা বলারই তাদের কোন অধিকার থাকবে না। কেননা বাদী যখন সাক্ষী পেশ করে তখন যদি বিবাদী সাক্ষীগণকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে পারে তখনই সাক্ষীগণকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। সাক্ষী পেশ হওয়ার পর বিবাদীর শুধু একথা বলাই যথেষ্ট হবে না যে, আমি তাদেরকে সত্যবাদী মনে করি না। আল্লাহ তাআ'লা যেমন প্রত্যেক নবীর উম্মতগণের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তেমনি নবীদের কাছেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাক্ষ্য মহা বিচারের দিন আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) -কেও একজন অন্যতম সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

 “ যখন প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব, তখন কি অবস্থা হবে।” (সূরা নিসা- ৬ রুকু ) আয়াত দ্বারা প্রত্যেক উম্মতের নবী এবং প্রতিটি যুগের পুণ্যবান বিশিষ্ট লােকের সাক্ষী প্রদানের কথা বুঝান হয়েছে। তারা মহাবিচারের দিন মানুষের
বাধ্যতা ও অবাধ্যতা অবস্থা সম্পকে সাক্ষ্য প্রদান করবেন। 


হযরত ঈসা (আ) -এর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ 

ময়দানে হযরত ঈসা (আ) -এর কাছেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
 “ যখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ওহে ঈসা ইবনে মরিয়ম! তুকি কি লােকদেরকে একথা বলেছ যে, তােমরা আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে আমাকে এবং আমার মাতাকে মা'বুদরূপে গ্রহণ কর?”( সূরা মায়েদা- শেষ রুকু) তখন “ হযরত ঈসা (আ) বলবেন, আপনি সর্বপ্রকার দোষমুক্ত ও পবিত্র সত্তা। আমার পক্ষে সে কথা বলা কোনক্রমেই শােভনীয় নয় যে কথা বলার কোন অধিকার আমার নেই। এরূপ কোন কথা আমি যদি বলে থাকি, তাহলে অবশ্যই আপনার তা জানা আছে। আমার অন্তকরণের কথা তাে আপনি ভাল জানেন। কিন্তু আপনার জ্ঞানে যা কিছু আছে, তা আমার জানা নেই। নিঃসন্দেহে আপনি গােপন বিষয় ভালভাবে অবগত। আমি তাদেরকে কেবল সে কথাই বলেছি, যা আপনি আমাকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর তা হল, তােমরা একমাত্র আল্লাহরই এবাদাত করবে যিনি হচ্ছেন আমার প্রতিপালক এবং তােমাদের প্রতিপালক। আমি তাদের মধ্যে যতদিন ছিলাম, ততদিনই আমি তাদের পর্যবেক্ষক ছিলাম। কিন্তু আপনি যখন আমাকে উঠিয়ে নিছেন, তখন আপনিই ছিলেন তাদের রক্ষক ও পর্যবেক্ষক। আপনি প্রতিটি বস্তু ও বিষয় সম্পর্কে পূর্ণরূপে ওয়াকেফহাল। আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন, তাে দেয়ার অধিকার আছে, কেননা তারা আপনারই বান্দা। আর যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন, তবে তারও অধিকার আপনার রয়েছে। কেননা আপনি হচ্ছেন প্রতাপশালী ও প্রজ্ঞাময় সত্তা।” —সূরা মায়েদা, শেষ রুকু।


এ আয়াতে যদিও ক্ষমার কথা উত্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু যারা কাফের ও মুশরেক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের ক্ষমা পাত্রে বিধান নেই। খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা কুফরী ও শেরকী করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, নিঃসন্দেহে তারা জাহান্নামী হবে। কেননা তারা নিজেদের নবীর হেদায়াত বর্জন করে পথভ্রষ্ট ও কাফের হওয়ার কারণে অবশ্যই তাদেরকে চিরন্তন শাস্তি ভোগ করতে হবে।


ফেরেশতাদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ

মহাবিচারের দিন আল্লাহ তাআ'লা কাফের মুশরেকদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের কাছেও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন যে, তােমরা তাদেরকে তোমাদের পূজা অর্চনা করার জন্য বলেছ কি না? এ জিজ্ঞাসার অর্থ হচ্ছে- তােমরা তাে তাদেরকে এরূপ করতে বলনি এবং তাদের এ কাজে তোমরা খুশিও ছিল না। উপরােক্ত জিজ্ঞাসার জবাবে ফেরেশতাগপ যে উত্তর প্রদান করবেন কোরআনের ভাষায় তা নিম্নরূপ : “প্রতুত্তরে ফেরেশতাগণ বলবে, হে প্রভু! আপনি পবিত্রময়। তারা নয়, আপনিই আমাদের অভিভাবক। তারা বরং জিনদের এবাদাত করত। তাদের অধিকাংশ তাদের প্রতিই ঈমান রাখত।” (সূরা সাব- ৫ম) অর্থাৎ এরা আসলে আমাদের পূজা-অর্চনা করত না বরং তারা শয়তানের এবাদাত বন্দেগী করত। শয়তান তাদেরকে যেদিকে চালাতাে, তারাও সে দিকেই চলত। তাতে তারা ফেরেশতাদের নাম উচ্চারণ করুক বা কোন নবী-রাসূল কিম্বা ওলী শহীদ কিংবা পীর ফকীরদের নাম বলুক না কেন। তাদের মূল চালক ছিল শয়তান । অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আজ তােমাদের মধ্যে কেউ আর কারাে উপকার করার অধিকারী হবে না এবং কারাে ক্ষতিও করতে পারবে না। তখন আমি কালেমদেরকে (কাফের মুশরেক) বলব, তােমারা অগ্নি শাস্তি উপভােগ কর, যাকে তােমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে।" সূরা সাবা  ।


জিনদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ

হাশর ময়দানে আল্লাহ তাআলা জিনদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
            “যেদিন আল্লাহ তাআলা সকলকে জমায়েত করবেন, সেদিন তিনি বলবেন, হে জিন সম্প্রদায়! তােমরা মানুষের মধ্যে বহু লোককে নিজেদের অনুগত করেছিলে।”
দুনিয়ায় যারা বিভিন্ন দেব-দেবী ও মূর্তির পুজা অর্চনা করে, তারা মূলত দুই জিন ও শয়তানেরই পূজা করে থাকে, আর মনে করে যে, তাদের দ্বারা আমাদের উপকার হবে। তাই তারা তাদের উদ্দেশ্যে নজর নেয়াজ ও নৈব্য পেশ করে । তাদের চতুর্দিকে নর্তন-কুর্দন করে গান গায়, বিভিন্ন বাজনা বাজায়। পূর্বকালে বর্বর যুগের নিয়ম ছিল যে, বিপদ-আপদকালে তারা জিনদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করত। মহাবিচারের দিন যখন জিনদেকে এবং তাদের যারা পূজা অর্চনা করত তাদেরকে ডাকা হবে, তখন মুশরেকগণ বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তাে সাময়িক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। মৃত্যুর নির্ধারিত দিনটি আগমনের পূর্বেই পার্থিব প্রয়ােজনার্থে আমরা একে অপর থেকে কাজ নেয়ার একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলাম।


“আল্লাহ তাআলা তখন বলবেন, জাহান্নামের আগুনই হচ্ছে তােমাদের বাসস্থান। তাতে তোমরা চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। তবে আত্নাহ তাআলার যা ইচ্ছে হয়। আপনার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময় ও সর্বত্র। এমনিভাবে আমি আলেমদের একজনকে অপরজনের সাথে সাক্ষাত করা, তাদের কৃতকর্মের কারণে (সুরা আনআ'ম) ।
অতঃপর আল্লাহ বলেন : “হে জিন ও মানব জাতি! তােমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য হতে রাসূল আসেনি? যারা তােমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাত এবং তােমাদেরকে এ দিনের সাক্ষাত সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করুত। তখন তারা স্বীকার করে নেবে যে, আমরা গুনাহের কথা স্বীকার করছি। পার্থিব জীবনে তাদেরকে ধোঁকা দিয়েছিলাম। তারা নিজেরাই স্বীকার করবে যে,তারা কাফের ছিল।' সূরা আনআম ।

এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট যে, জিন ও মানুষ উভয় সম্প্রদায়কে একত্রেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে যে, তােমাদের কাছে কি নবী-রাসূলপণের আগমন
ঘটেনি? এর উত্তরে তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করবে এবং বলবে, হাঁ আমাদের কাছে নী-রাসূলগণ এসেছিলেন। কিন্তু আমরা তাঁদের কথা শুনিনি এবং মানিনি, সুতরাং আমরাই অপরাধী। এ আয়াতেই উল্লেখ হয়েছে যে, তারা নিজেরা কাফের হওয়ার কথা স্বীকার করবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য