হাউজে কাউসারের বৈশিষ্ট্য ও হাউজে কাউসার থেকে যারা পানি পাবে ? হাশরের ময়দান Islamic Bangla Golpo

 

হাউজে কাওছারের পানি ও করীম (সঃ) এর ঘটনা

হাউজে কাওছারের পানি ও করীম (সঃ) এর ঘটনা 

একদা সাহাবী নবী করীম (সঃ) -এর কাছে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কি কেয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবেন? নবী করীম (সঃ) বললেন, হাঁ; আমি তােমার জন্য সুপারিশ করব। সাহাবী বললেছিল হাশর ময়দানে আমি আপনাকে কোথায় সন্ধান করব? তিনি বললেন, প্রথমত আমাকে পুলসেরাতের কাছে সন্ধান করবে। সাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলো, সেখানে আপনাকে না পেলে কোথায় সাক্ষাত করব? তিনি বললেন আমলনামা পরিমাপের জন্য দাঁড়িপাল্লার স্থানে সন্ধান করবে। সাহাবী বললো সেখানেও না পেলে আমি আপনার সাক্ষাতের জন্য কোথায় যাব? তখন নবী করীম (সঃ) বললেন, হাউজে কাওছারের কাছে আমাকে সন্ধান করবে। এ তিনটি স্থানের কোন একটি স্থানে অবশ্যই আমাকে পাবে। —তিরমিযী, মেশকাত।


হাশর ময়দানে বিপুল সংখ্যক বড় বড় হাউজ থাকবে। নবী করীম (সঃ) বলেন, প্রত্যেক নবীর জন্যই এক একটি হাউজ থাকবে। আর প্রত্যেক নবীই যার পানকারীদের সংখ্যা বেশি হবে সেজন্য গৌরব বােধ করবেন। প্রত্যেক নবীর হাউজ থেকে তার নিজ নিজ উম্মতগণ পানি পান করবে। আমি আশা করি সর্বাধিক সংখ্যক লােক আমার কাছে পানি পান করার জন্য আসবে (কারণ অন্যান্য নবীর উম্মতের তুলনায় উম্মতে মুহাম্মদীর সংখ্যা হবে সর্বাধিক)। তিরমিযী


রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমার হাউজে কাওছারটি এত লম্বা ও প্রশস্ত হবে, যার এক দিক হতে অন্য দিকে যাওয়ার জন্য এক মাসের সময়ের প্রয়ােজন হবে। হাউজটি সমান চৌকোণ বিশিষ্ট। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ও প্রশস্ত সমান। তার পানি দুধের চেয়েও শুভ্র এবং তার সুঘ্রাণ মেশকের চেয়েও উত্তম হবে। আর তার লােটা বা পান পাত্রগুলাে আকাশের তারকার সংখ্যার সম পরিমান হবে। কেউ আমার হাউজে কাওছারের পানি একবার পান করলে সে আর কখনাে তৃষ্ণার্ত হবে না। বােখারী, মুসলিম।


অন্যান্য নবীর উম্মতগণ আমার হাউজে কাউছারের কাছে আসলে আমি তাদেরকে বিতাড়িত করব। যেমন দুনিয়ায় অন্য লােকের উটকে নিজের হাউজে পানি পান করা হতে বিতাড়িত করা হয়। সাহাবী (রাঃ) গণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ দিন কি আপনি আমাদেরকে চিনতে পারবেন? নবী করীম (সঃ) বললেন, অবশ্যই চিনতে পারব। কেননা সেদিন তােমাদের একটি বিশেষ নিদর্শন হবে। সে নিদর্শন অন্য কোন উম্মতের হবে না। আর তা হল তােমরা হাউজে কাউছারের নিকট আমার কাছে এমন অবস্থায় আসবে যে, তখন অযুর প্রভাবে তােমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে এবং পদ ও হস্তযুগল হবে (কনুই পর্যন্ত ও পদযুগল গিরা পর্যন্ত) শুভ্র। —মুসলিম।


নবী করীম (সঃ) আরও বলেছেন, আমার হাউজে কাউছারের দু'টি প্রবাহমান প্রণালী থাকবে, যার মাধ্যমে জান্নাতের নহর হতে পানি প্রবাহিত হয়ে হাউজে কাউছারের পানি বৃদ্ধি করবে। সে প্রণালী দুটির একটি হবে স্বর্ণের এবং অপরটি হবে রৌপ্যের প্রণালী। —মুসলিম।


আমার এ হাউজের কাছে সর্বাগ্রে যারা উপস্থিত হবে তারা হচ্ছে মুহাজিরদের মধ্যে দরিদ্র ব্যক্তিগণ। উপস্থিত লােকদের মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি অবস্থায় উপস্থিত হবে? নবী করীম (সঃ) বললেন, দুনিয়ায় যাদের মাথার চুল এলােমেলাে ছিল, আর পরিশ্রম ও ক্ষুধা ও ক্লান্তির কারণে যাদের চেহারা পরিবর্তিত হয়েছিল, তাদের জন্য রাজা-বাদশা ও শাসকদের দরজা থাকত রুদ্ধ। উত্তম ও সুন্দরী রমনীদেরকে তাদের কাছে বিয়ে দেয়া হত না । তাদের জিম্মা ও দায়িত্বে কারাে কোন হক থাকলে তা যথাযথভাবে আদায় করা হত। আর তারা কারাে কাছে পাওনা থাকলে, তা পুরাপুরি ফিরায়ে দেয়া হত না বরং কিছু হ্রাস করা হত। —আত্তারগীব আত্তারহীব।


অর্থাৎ দুনিয়ায় তাদের অভাব-অনটন এতটা প্রকট ছিল যে, মাথার চুল পারিপাটি করার এবং পরিধানের কাপড় পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখার মত আর্থিক ক্ষমতাও তাদের ছিল না। বাহ্যিকভাবে পারিপাটি ও সুমার্জিত্ব হয়ে চলার দিকে তাদের মনে কোন প্রবণতাও ছিল না। এর প্রতি তারা খেয়ালও করতেন না, এজন্য সময় ব্যয় করাকেও তারা পছন্দ করতেন না। পরকালের চিন্তা ও কাজে ব্যাঘাত হয় এমন কোন কাজ তারা করতেন না দুনিয়ায় তাদের দুঃখ দুর্দশা ও চিন্তা-ভাবনা তাদেরকে এতটা বিষন্ন রাখত যে, পরিপাটি করার খেয়ালই তাদের মনে উদয় হত না। তাদের চেহারায় ফুটে থাকত দুঃখ দৈন্যতার ছাপ। দুনিয়ার মানুষ তাদেরকে এতটা তুচ্ছ জ্ঞান করত যে, দুনিয়ার মজলিস ও অনুষ্ঠানে তাদের দাওয়াত দেয়া তাে দূরের কথা, সেসব স্থানের দরজা থাকত তাদের জন্য রুদ্ধ। আর ধনাঢ্য ও কুলিন পরিবারের মেয়েদেরকেও আল্লাহর এসব খাস বান্দাদের সাথে বিয়ে দেয়া হত না। কিন্তু পরকালে তাদের সম্মান ও মরতবা হবে সবার চেয়ে উন্নত। তারাই সর্বাগ্রে হাউজে কাউছারের কাছে উপস্থিত হবেন। অন্যান্য লােকেরা তাদের পরে এসে এ পবিত্র হাউজে পানি পান করবে। তবে শর্ত হল ঈমানদার ও পুণ্যবান বান্দা হতে হবে।


হাউজে কাউছার হতে যারা বিতাড়িত হবে?

হযরত সাহল ইবনে সাহদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমার কাছে পানি পান করার জন্য এমন কিছু লােকের আগমন হবে, যাদেরকে আমি চিনব এবং তারাও আমাকে চিনবে। কিন্তু তারপর আমার ও তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে, তারা তখন পানি পান করা হতে বঞ্চিত হবে। আমি তখন বলব এরা আমার লােক, এদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে কেন? তাদেরকে আসতে দেয়া হােক। তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, এরা আপনার অবর্তমানে ধর্মের ব্যাপারে কি কি নতুন নতুন বিদয়াত সৃষ্টি করেছে। একথা শুনে আমি বলব, আমার থেকে তােমরা দূর হও দূর হও, যারা আমার পর দ্বীনের মধ্যে নানা রকম বিদয়াত ও নতুনত্ব সৃষ্টি করছ। =বােখারী, মুসলিম।


কোরআন-হাদীসে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে এবং তা থেকে যা কিছু উদ্ভাবন হয়, সে অনুযায়ী জীবন যাপনে মধ্যেই রয়েছে ইহকাল-পরকালের কল্যাণ। এ যমানার মানুষ ধর্মের মধ্যে হাজার প্রকার বিদয়াত সৃষ্টি করে রেখেছে। দ্বীনের মধ্যে কোরআন সুন্নাহর বিপরীত নতুনত্ব সৃষ্টি করে তার প্রচলন ঘটিয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়া অর্জন করা এবং নফসের দাবী পূরণ করে কিছু স্বার্থ হাসীল করা। দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার বিদয়াত রুসুম রেওয়াজে ভরে গেছে। এসব বিদায়ী লােকদেরকে দ্বীনের কথা বুঝান হলে এবং বিদয়াত গুনাহের কথা বলা হলে তারা তা খারাপ মনে করে থাকে। আমাদের সকল সােজা কথা হচ্ছে, যে কোন কাজই করা হােক না কেন, নবী করীম (সঃ) যা কিছু বলেছেন এবং যা কিছু করেছেন সে অনুযায়ীই আমল করতে হবে। বর্তমান যুপে অগণিত পীর-ফকীরণ শত সহস্র প্রকার বিদয়াত সৃষ্টি করে দ্বীনের নামে নতুন এক বাজার সৃষ্টি করে রেখেছে। তারা এ বাজার থেকে খাজনা টসল করে। তাদের কাছে এসব কাজের দলিল প্রমাণ চাওয়া উচিত বা জিজ্ঞেস করা উচিত যে, এসব কাঞ্জ নবী করীম (সঃ) করেছেন কি না? অথবা কোরআন হার্দীসের কোন কিতাবে আছে কি না? কিংবা নবী করীম (সঃ) এসব কাজ করা পছন্দ করেছেন কি না ?


জনু-মৃত্যু ও বিয়ে শাদীর ব্যাপারে মহিলাগণ এবং পীর-ফকীরগণ বিরাট বিরাট বিদয়াত ও শরীয়তের বিপরীত কুসুম রেওয়াজ সৃষ্টি করে রেখেছে। সুয়ম পালন, চেহলাম পাথন, কবরের উপর মুল্যবান গিলা বিজ্ঞান, কবরকে গােসল দান, কবরের উপর আতর গোলাপ হিটান ও আগর বাতি জালান ইত্যাদি নানা কম বিদয়াত সমাজে প্রচলন করা হয়েছে। এসব বিদয়াতের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা উচিত । হাশর ময়দানে প্রচণ্ড তৃষ্ণা-কাতর অবস্থায় তারা কি হাউজে কাউছার হতে বিতাড়িত হতে প্রস্তুত? তা তাদের চিন্তা করা উচিত। কবরকে কেন্দ্র করে উরসের গরম বাজারের কথা তাে আছেই। তদুপরি কবরকে সেজদা করা, পীর ফকীরকে সেজদা করা শুধু বিদয়াতই নয় বরং সুস্পষ্ট শিরকী কাজ ! এ কাজ করলে ঈমান থাকে না। অতএব আমাদের চিন্তা করা উচিত এ যুগের পীর-ফকীরেরা নিজেরা কোথায় গিয়ে পৌছেছে এবং তাদের মুরীদগণকে ওরা কোথায় নিয়ে পেীছিয়েছে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য