আরব জাতির নেতৃত্বে আসার ইতিহাস । আরব জাতির উৎপত্তির ইতিহাস



একটি জাতি


এই ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবীর মধ্যে একটি জাতি ছিল। যে জাতিটি তখনও কোনো রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি; বরং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মাত্র। এই জাতির নাম আরব জাতি। আরবরা সবে নিজেদের অস্তিত্ব ও এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছিল তখন । পাশাপাশি তারা আঁচ করতে পারছিল চতুষ্পার্শ্বে থাকা সমূহ বিপদ । 



বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এই জাতি তার ভ্রান্তি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছিল প্রতিনিয়ত। পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর অভিমুখে ভ্রমণ করার সময় বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোকে প্রায়ই বিশাল মরুভূমি অতিক্রম করতে হতো। এই বিস্তীর্ণ মরুর পুরোটাই ছিল স্বাধীনচেতা আরবজাতির দখলে। আরবরা ছিল তৎকালীন ম্রিয়মাণ বিশ্ব পরাশক্তির শাসন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। 



তবে রোম ও পারস্যের ক্ষমতা যখন তুঙ্গে, তখন আরবরাও তাদের আয়ত্তাধীন হওয়ার ভয়ে ছিল তটস্থ। তবে অচিরেই তারা আবিষ্কার করল পারস্য ও রোমান সভ্যতাও অনেকাংশেই তাদের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত অর্থেই বাণিজ্যিকভাবে তারা ছিল কার্যত আরবদের নিয়ন্ত্রণাধীন। আরবরা যদি নিজ ভূখণ্ডে তাদের ব্যাবসা করার অনুমতি না দিত, তাহলে বাণিজ্যিকভাবে তারাই

ক্ষতিগ্রস্ত হতো ।



 তা ছাড়া ইয়েমেন ও শাম দেশে ব্যবসায়িক সফরের সময়েও এই দুই পরাশক্তির বণিকদের আরব উপত্যকার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যার চারপাশ ছিল মরুচারী আরব বেদুইন দ্বারা বেষ্টিত। কিন্তু এই ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একপর্যায়ে মক্কার শাসনভার গ্রহণ করার জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস। 



আবার নিজ দেশে আরেকটি তীর্থস্থান নির্মাণের মানসে ইয়েমেনের গভর্নর আবরাহা অভিযান পরিচালনা করে কাবাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে; এমনকী অরক্ষিত আরব উপত্যকার দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্ত দিয়ে শুরু হয় পারসিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশ। এমন বিরূপ প্রতিবেশের মধ্যে হঠাৎ করেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদ অনুভব করল আরব জাতি । 



তারা লক্ষ করল- তাদের বিশাল মরুদেশ ইতোমধ্যেই কঠিন হুমকির মুখোমুখি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোই তাদের সমূহ বিপদের কারণ। শত্রুর উপস্থিতিতে তাদের জাতিসত্তাই ধ্বংস হতে চলেছে প্রায়। তারা বুঝতে পারল - এ উপত্যকা বাঁচাতে হলে নিজস্ব ভূখণ্ডের যাবতীয় ঘাটতি ও দুর্বলতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই ।



এই মরুময় উপত্যকার মধ্যেই ছিল এক শহর। গোটা আরবের সম্পদসমূহ একীভূত হতো সেখানে। আর এই পুরো সম্পদের মালিকানা ভোগ করত শহরের সব থেকে ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বংশ। তখনকার সমাজব্যবস্থায় একদিকে যেমন বিলাসিতা, অবাধ যৌনাচার, মদ্যপান, জুয়া আর সম্ভোগের মচ্ছপ চলছিল, ঠিক অন্যদিকে ছিল দরিদ্রতার কষাঘাত, দুঃখ, যাতনা আর সীমাহীন দাসত্ব । 



এহেন শোচনীয় পরিস্থিতিতে আরবের বুকে প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী আদর্শ । কিন্তু যখনই সমাজের বিজ্ঞজনরা ধর্ম ও আদর্শের কথা বলতেন, তখনই পূর্বপুরুষদের অনুসৃত মিথ্যাচারের দোহাই দিয়ে সেসব প্রত্যাখ্যান করত একটি দল। একবার নাখলায় একদল লোক গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি ওজ্জাকে কেন্দ্র করে পূজার আয়োজন করে। তাদের মধ্য একজন হঠাৎ বলে উঠল-


‘আল্লাহর শপথ! আমাদের কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই। আমরা যা করছি, তা নিতান্ত মিথ্যাচার। একটি পাথরের মূর্তি যেটি কিছু দেখতে বা শুনতে পায় না, কারও উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে না, সেটিকে ঘিরে তাওয়াফ করে কী লাভ! সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই নিশ্চল প্রস্তরের মাথায় প্রথানুযায়ী রক্ত ঢালার কোনো অর্থ নেই । অতএব, হে লোকসকল! চলো আমরা অন্য কোনো ধর্ম খুঁজি।'



এই আহ্বানের পর একদল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হলো । কিছু লোক গ্রহণ করল সন্ন্যাসব্রত। আরেকটি দল অপেক্ষা করতে লাগল নতুন কিছুর আশায়। অবশেষে যখন ইসলাম আভির্ভূত হলো, তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করল ইসলামের ছায়াতলে । ইসলাম আসার পূর্বেই যারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল ওয়ারাকা ইবনে নওফেল।



 এই ওয়ারাকাই পরবর্তী সময়ে তাওরাত থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে নবিজির নবুয়তের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিলেন। আর যারা প্রচলিত মিথ্যা ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি নতুন ধর্ম ও আদর্শ খুঁজছিল, তারা সবাই ওয়ারাকার এই কথা বিশ্বাস করে নিলো । অন্য একটি দল বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে সুবিচারের খোঁজ করছিল সর্বত্র । 



হাশেম, জোহরা ও তাইম গোত্রের বংশধরগণ আল্লাহর নামে একটি চুক্তি সম্পাদন করল এই মর্মে—‘যেখানেই জুলুম সংঘটিত হোক না কেন, তারা অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়াবে।' এই চুক্তিই ইতিহাসে হিলফুল ফুজুল নামে পরিচিত। নবিজি যৌবনে এই চুক্তিটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বলেছিলেন- ‘আমি ইবনে গাদানের বাড়িতে সবকিছুর তুলনায় এই চুক্তিকেই অধিক ভালোবাসতাম।'



সব মিলিয়ে আরব তখন নিজেকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে গড়েতোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। চতুষ্পার্শ্বে শত্রুর আনাগোনা আর মাথার ওপর ধ্বংসের ঘণ্টাধ্বনি বাজতে থাকলেও পুরোপুরি ধসে পড়েনি এই জাতি। কারণ, চূড়ান্ত পতনের পূর্বেই তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এভাবে ধীরে ধীরে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও সংস্কারের দিকে ধাবিত হচ্ছিল সমগ্র আরব জগৎ।



একটি গোত্র


আরবের ওই শহরে ছিল একটি সম্ভ্রান্ত গোত্র। এই গোত্রের আবার দুটি শাখা ছিল। একটি শাখা নিয়ন্ত্রিত হতো ক্ষমতাসম্পন্ন লোকজনদের দ্বারা। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তারা যেকোনো কিছুই

করতে পারত। কামনা-বাসনা মেটানোর ক্ষেত্রে তারা ছিল ঐতিহ্যগতভাবেই প্রচণ্ড লোভী। অন্যদিকে আরেকটি দলে ছিল ধর্মভীরু লোকজন। 



স্বভাবের দিক থেকে তারা ছিল অত্যন্ত সহিষ্ণু। তারা প্রায়শই সবলের অত্যাচার থেকে দুর্বলকে মুক্ত করে উভয়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করে দিত।